জীবনসঙ্গীর যেসব বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলী প্রত্যাশা করেন:
আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী প্রত্যাশা করি, যিনি কেবল বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার হবে না, বরং প্রকৃত অর্থে উত্তম দ্বীনদার, গাইরতবান, তাকওয়াবান, মুত্তাকী, পরহেজগার, আমানতদার, দায়িত্বশীল, হায়াসম্পন্ন ও loyal হবে। উনার দ্বীন লেবাসে যেমন প্রকাশ পাবে, তার চেয়েও বেশি প্রকাশ পাবে উনার আকীদা, ইবাদত, আখলাক, আমানতদারি, সৎ, সহনশীল, মুআমালাত ও ব্যক্তিজীবনেও থাকবে। উনার আকীদা বিশুদ্ধ হতে হবে, সকল প্রকার শিরক ও বিদআত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। নম্র, ভদ্র হতে হবে। ঝগড়াটে হওয়া যাবে না। কটু কথা বলা যাবে না। দ্বীনের ব্যাপারে আপোষহীন হতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ-নিষেধকে নিজের জীবনের মাপকাঠি বানাতে হবে। শুধু পরিচয়ে বা লেবাসে না, দিল, আমল ও আখলাকে দ্বীনকে ধারণ করার চেষ্টা থাকতে হবে। তিনি চক্ষু ও জবানের হেফাজতকারী হবেন। বেগানা নারীর ব্যাপারে কঠোরভাবে মাহরাম-গাইরে মাহরাম বজায় রাখবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতি জরুরত ছাড়া নিজের কিংবা কোনো বেগানা নারীর ছবি/ভিডিও আপলোড করবেন না। গুনাহের দরজা খুলে দেয় এমন সবকিছু থেকে নিজেকে বাঁচানোর ফিকির থাকবে। ধূমপান কিংবা কোনো প্রকার নেশাজাতীয় অভ্যাস থাকা চলবে না। হারাম সবকিছু থেকে দূরে থাকার মুজাহাদা থাকতে হবে। আমি এমন একজনকে চাই, যিনি ফরজ ইবাদতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি নফল ইবাদতেও আগ্রহী, গোপনে এমন কিছু আমল রাখেন যার খবর দুনিয়ার মানুষ জানে না। তাঁর আমল হবে ইখলাসপূর্ণ, রিয়া থেকে নিজেকে হেফাজত করার চেষ্টা থাকবে। মানুষের প্রশংসার জন্য না, রবের সন্তুষ্টির জন্য আমল করার মানসিকতা থাকবে। কারণ, মানুষের চোখে নেককার হওয়া আর আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া তো এক কথা না। আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী চাই, যার নির্জনতার আমলও তার প্রকাশ্য জীবনের মতো সুন্দর হবে। যে মানুষকে দেখানোর জন্য না, রবকে রাজিখুশি করানোর জন্য ভালো হতে চায়। নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত স্বলাত জামায়াতের সাথে আদায় করতে হবে। পোশাক-আশাকে কোনো উগ্রতা বা অহংকার থাকা যাবে না। উনার অন্তরে আখিরাতের ফিকির থাকতে হবে। দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। দুনিয়া হাতে থাকবে, কিন্তু দিলের মাকাম হবে আখিরাত। আল্লাহ রব্বুল ইজ্জাহ এর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা থাকবে। অল্প হোক, কিন্তু ইনকাম অবশ্যই হালাল হতে হবে। হারাম বা সন্দেহযুক্ত উপার্জনের প্রতি কোনো লোভ থাকবে না। যৌতুকলোভী বা দুনিয়াবি লোভী হওয়া যাবে না। আমানতদার, সত্যবাদী, বিনয়ী, দানশীল, সহযোগী ও নরম দিলের অধিকারী হতে হবে। অহংকারমুক্ত হতে হবে। কটু কথা, অকারণে রাগ, গালিগালাজ, অভিশাপ, খিটখিটে মেজাজৎএসব থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা থাকতে হবে। জবানে সর্বদা শালীনতা ও আদব থাকতে হবে। রাগের সময় নিজেকে সামলানোর মুজাহাদা, নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত করার ফিকির থাকতে হবে। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া স্বভাব হবে না। ভুল হলে ভুল স্বীকার করার মানসিকতা থাকবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে। যিনি আমাকে কেবল নিজের আহলিয়া হিসেবে না, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত হিসেবে দেখবেন, আমার প্রতি উনার সম্মান থাকবে, নিরাপত্তা থাকবে, হক থাকবে, মুহাব্বাত থাকবে। পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা করে দিতে হবে, দ্বীনি ইলম হাসিলের পথে সহযোগী হতে হবে। কোনো ভুলত্রুটি হলে অপমান, তিরস্কার বা কটু কথায় না বলে আদব, হিকমাহ ও মুহাব্বাতের সঙ্গে শুধরে দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। যে হাতে সংসারের দায়িত্ব থাকবে, সেই হাত যেন জুলুমের হাত না হয়। যে জবান সংশোধন করবে, সেই জবান যেন অপমানের জবান না হয়। আমার সকল হক আদায় করার চেষ্টা থাকতে হবে, প্রয়োজন-হাজতগুলো পূরণ করার দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে। আমি অসুস্থ বা ক্লান্ত থাকলে ঘরের কাজে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। ছোটখাটো ভুলত্রুটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাস থাকতে হবে। কথায় কথায় পুরোনো ভুল টেনে এনে খোঁটা দেওয়া যাবে না। অকারণে সন্দেহ করা যাবে না। কৃপণ হওয়া যাবে না, আবার অপচয়কারীও হওয়া যাবে না। স্ত্রীর প্রতি সম্মান, কোমলতা, বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। আহলিয়াকে নিজের দ্বীনের পথে সহযোগী হিসেবে দেখতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না। আমাকে দ্বীনের বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে। আমার দ্বীনি ইলম হাসিল, আমল, দাওয়াহ ও নেক কাজের পথে সঙ্গী হতে হবে। আমি যেন তাঁর সঙ্গে থেকে আল্লাহ তাআলার দিকে আরো এগিয়ে যেতে পারি এই আকাঙ্ক্ষা থাকবে ইনশাআল্লাহ। পোশাক-আশাক ও চালচলনে রাসূলে আরাবি ﷺ এর সুন্নাহর ইত্তেবা করার আন্তরিক চেষ্টা থাকতে হবে। যেমন সুন্নতি দাঁড়ি, বাবরি চুল, পাঞ্জাবি বা জুব্বা, মেসওয়াক করা এবং সর্বোপরি নববী আখলাক ধারণের চেষ্টা। তবে শুধু বাহ্যিক সুন্নাহ না, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা, দয়া, সবর, গাইরত, উত্তম মুআমালাত ও উত্তম আখলাকেও সুন্নাহর অংশ হিসেবে নিজের জীবনে আনার চেষ্টা থাকতে হবে। উনার বই পড়ুয়া হতে হবে, ত্বলিবুল ইলম হওয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। শুধু ইলম সংগ্রহ করে রাখা না, ইলম অনুযায়ী আমল করার মেহনত থাকতে হবে। দ্বীনের দাওয়াহ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে এবং দ্বীনের সাচ্চা দাঈ হওয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। উম্মতের জন্য দিলের মধ্যে দরদ থাকতে হবে। উম্মতের দুঃখ-কষ্টকে একেবারে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করা যাবে না। নিজের পরিবারকে ইসলামিক পরিবেশে গড়ে তোলার ফিকির থাকতে হবে। আমি এমন একজনকে চাই, যিনি নিজের পরিবার ও আহলিয়াকে যেকোনো অন্যায়, পাপাচার এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি থেকে হেফাজত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা রাখবেন। সন্তান হলে তাদের শুধু দুনিয়ার সফলতার জন্য না, মুজাহিদ মানসিকতার, দ্বীনদার, তাকওয়াবান ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার হিম্মত থাকবে। সন্তানদের জন্য বড় বাড়ি, বড় গাড়ি, দুনিয়াবি পরিচয়ের আগে তাঁদের ঈমান, আকীদা, আখলাক ও আখিরাত নিয়ে চিন্তা থাকবে। উনি অলস হবেন না। হালাল উপায়ে কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকবে। সংসারের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে না গিয়ে আমানত হিসেবে গ্রহণ করবেন। প্রচুর সবর করার মানসিকতা থাকতে হবে। জীবনে মতভেদ আসতেই পারে, ক্লান্তি আসতেই পারে, কঠিন সময় আসতেই পারে কিন্তু প্রতিটা সমস্যাকে ঝগড়া, গালি, অপমান কিংবা বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেওয়া না বরং সবর, শূরা, হিকমাহ ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দিকে ফিরে সমাধানের চেষ্টা থাকতে হবে। নিজের নফস, রাগ ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার মেহনত থাকতে হবে। কুফু অবশ্যই মিলতে হবে। দ্বীন, আকীদা, চিন্তাধারা, জীবনদর্শন ও পারিবারিক মূল্যবোধে সামঞ্জস্য থাকা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার বাধ্য সন্তান হতে হবে। তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্ত্রী ও নিজের পরিবারের প্রত্যেকের হক বুঝে ন্যায় ও হিকমাহর সঙ্গে চলার মানসিকতা থাকতে হবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। পরিবারকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না, আবার কোনো অন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়ানো যাবে না। আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী চাই, যিনি চট্টগ্রামের প্রচলিত সংস্কৃতির এমন কোনো রীতি-রেওয়াজের অনুসরণ করবে না যেটা শরিয়াহসম্মত না, এবং বিশেষত চট্টগ্রামে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে প্রচলিত বিদআতপূর্ণ আয়োজন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। দ্বীনের ব্যাপারে আপোষ না করে কুরআন-সুন্নাহ ও বিশুদ্ধ আকীদার ওপর অটল থাকার চেষ্টা থাকবে। আর বিবাহিত জীবনে একাধিক বিবাহের পরিবর্তে আমাতেই সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা থাকতে হবে। আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী চাই, যিনি স্ত্রীকে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না রেখে বিশ্বস্ততা, দায়িত্ব ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে সংসার করার অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেবেন। সবশেষে, এতগুলো গুণের ভিড়ে আমার আসল চাওয়াটা খুব ছোট্ট। তিনি যেন আল্লাহকে ভয় করেন, প্রকৃত উত্তম দ্বীনদার হন। কারণ মানুষ যদি সত্যিই আল্লাহকে ভয় করেন, তাহলে আমি আশা করতে পারি তিনি আমানতদার হবেন, সত্যবাদী হবেন, গাইরতবান হবেন, আহলিয়ার হক বুঝবেন, চোখের হেফাজত করবেন, জবান সামলাবেন, রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন, হারাম থেকে বাঁচবেন, সন্তানদের দ্বীনের ওপর গড়ে তুলবেন এবং ভুল হলে ফিরে আসার সাহস রাখবেন। আমি চাই, তিনি আমাকে দুনিয়ার মোহে না গিয়ে, রবের সন্তুষ্টির জন্য মুহাব্বাত করবেন। আমার প্রতি উনার মুহাব্বাত যেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার জন্য হয়, আর আমার সঙ্গে উনার জীবনযাপন যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটা মাধ্যম হয় ইনশাআল্লাহ। আমি উনার কাছে পরিপূর্ণ মানুষ হতে চাই না কারণ পরিপূর্ণতা মানুষের জন্য না। বরং এমন একজন মানুষ চাই, যিনি নিজের অপূর্ণতা চিনবেন, ভুল হলে ফিরে আসবেন, ইলম শিখবেন, আমল বাড়াবেন এবং প্রতিদিন নিজেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আরো উত্তম বানানোর চেষ্টা করবেন। আমি এমন একজন সঙ্গী চাই না, যে আমাকে শুধু দুনিয়ার পথে পাশে রাখবে, আমি এমন একজন জাওজ চাই, যার হাত ধরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দিকে হাঁটতে পারব ইনশাআল্লাহ। যার সঙ্গে কিতাব পড়া যাবে, ইলম শেখা যাবে, সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করা যাবে, একে অপরকে নেক কাজে উৎসাহ দেওয়া যাবে, যার সঙ্গে এই দুনিয়ার পথ পেরিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের দরজা পর্যন্ত চলার হিম্মত থাকবে। আমিও চাই, তাঁর জন্য দ্বীনের পথে সহযোগী হতে; তাঁর নেক মেহনতের সঙ্গী হতে; তাঁকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে উৎসাহ দিতে। যিনি প্রকৃত উত্তম দ্বীনদার, বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী, মুত্তাকী, গাইরতবান, আমানতদার, বিশ্বস্ত, দায়িত্বশীল, উত্তম আখলাকের অধিকারী, ত্বলিবুল ইলম, সুন্নাহপ্রেমী (দাঁড়ি, টুপি, বাবরি চুল, পাঞ্জাবি, পায়জামা, টাখনুর উপরে পায়জামা পরিধান করতে হবে), সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকবে, হানাফি মাযহাব অনুসরণ করবে, উম্মতের জন্য দরদী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনাকারী একজন মানুষ হবেন। গান-বাজনা বা হারাম সবকিছু থেকে দূরে থাকতে হবে ইনশাআল্লাহ। সময়ের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। রাগ, গীবত, পরনিন্দা, হিংসা, অহংকার, ঝগড়াটে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া যাবে না। অন্যের দোষ না খুজে নিজেকে দেখার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। আত্মসমালোচনা করতে হবে ইনশাআল্লাহ। তিনি আহলিয়ার দ্বীনের কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি ঘরের কাজে সহযোগিতা করার মন-মানসিকতা রাখবেন ইনশাআল্লাহ। সুন্নতি বিবাহ করতে হবে ইনশাআল্লাহ। বিঃদ্রঃ জীবনসঙ্গীর পরিবারও প্রকৃত উত্তম দ্বীনদার হবে ইনশাআল্লাহ। অন্তত ফরজ বিধান পালন করতে হবে ইখলাসের সহিত ইনশাআল্লাহ। আর রবের দেওয়া রঙ কালো/শ্যামলা রঙ, এমন রঙের অধিকারী আহলিয়াকে পছন্দ করবেন এমন হতে হবে ইনশাআল্লাহ! উপরিউক্ত আলোচনা অনুযায়ী অবশ্যই কুফু মিলিয়ে ইস্তিখারা করে অভিভাবক-কে কল দিবেন মিন ফাদ্বলিক।
|